অন্ধকারের অতিথি
m m
রাতের সময় গ্রামটি যেন একেবারেই নিস্তব্ধ। মেঘলা আকাশে চাঁদের আলোও লুকিয়ে আছে। গ্রামটির নাম ছিল কর্ণপুর, যা বহু বছর ধরে এক ভয়ংকর কাহিনীর জন্য পরিচিত। গ্রামের পুরনো বনটি অন্ধকার আর রহস্যে ঢাকা। সেখানে মানুষ খুব একটা যায় না। কেউ গেলে, ফিরে আসে না—এই কথাই প্রচলিত ছিল।
একদিন, শহর থেকে সুমন নামে এক তরুণ কর্ণপুরে আসে। গবেষক হিসেবে কাজ করে সে। রহস্যময় জায়গাগুলোর ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করা তার নেশা। কর্ণপুরের ভুতুড়ে কাহিনী শোনার পর থেকেই সে ঠিক করেছিল এই জায়গাটা দেখতে আসবে।
গ্রামে আসার পর, সুমন জানতে পারে যে বনটির ভেতরে একটি পুরনো পরিত্যক্ত বাড়ি আছে। লোকমুখে শোনা যায়, বাড়িটিতে এক সময় এক জমিদার তার পুরো পরিবারসহ বসবাস করত। কিন্তু এক রাতে বাড়ির সব লোক অদ্ভুতভাবে মারা যায়। কেউ বলে, তারা একে অপরকে হত্যা করেছিল, আবার কেউ বলে, কোনো অভিশাপ তাদের গ্রাস করেছিল। এরপর থেকে বাড়িটা ফাঁকা পড়ে আছে, আর সেই জায়গাটি নাকি ভুতের আবাসস্থল।
m m
সুমন গল্পগুলো শুনে আরো উৎসাহী হয়ে ওঠে। সে সিদ্ধান্ত নেয় রাতে সেই বাড়ি দেখতে যাবে। গ্রামের লোকেরা তাকে অনেকবার সাবধান করে। কিন্তু সুমনের কৌতূহল তাকে নিবৃত্ত করতে পারে না।
বাড়ির সামনে
রাত ঠিক বারোটা। সুমন একটি টর্চলাইট আর একটি নোটবুক নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। বাড়িটির কাছাকাছি এসে, তার হৃৎপিণ্ড যেন একটু দ্রুত চলতে থাকে। বাড়িটির সামনে বিশাল লোহার গেট। গেটের উপর ঝুলে থাকা মরচেধরা তালা ভেঙে পড়ে আছে। সুমন ধীরে ধীরে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে।
পুরো বাড়ি যেন সময়ের হাতছানিতে হারিয়ে গেছে। দেয়ালগুলো ফাটল ধরা, আর জানালার কাচগুলো ভাঙা। হঠাৎ বাতাসের সাথে জানালার পর্দা উড়ে উঠে ভয়ঙ্কর শব্দ তৈরি করে। সুমন মনে করে, এগুলো কেবল প্রকৃতির খেলা।
কিন্তু বাড়ির ভেতরে ঢোকার পর থেকেই সে অনুভব করে একটি অদ্ভুত শীতলতা। যেন কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে। টর্চলাইটের আলোতে সে এক এক করে ঘরগুলো দেখতে শুরু করে। একটি ঘরে সে একটি পুরনো ছবি দেখতে পায়। ছবিটিতে একজন বয়স্ক জমিদার, তার স্ত্রী আর ছোট একটি মেয়ে। সুমন ছবিটি ছুঁয়ে দেখার মুহূর্তে, হঠাৎই একটি শীতল হাওয়া তার গায়ে লাগে।
ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা
অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই সুমন বুঝতে পারে, সে এখানে একা নয়। পেছন থেকে মৃদু হাসির শব্দ আসে। সে ভয়ে পেছনে তাকায়, কিন্তু কিছু দেখতে পায় না। হঠাৎ টর্চলাইটটি নিভে যায়। চারপাশে শুধুই অন্ধকার।
তারপর, একটি মেয়ের করুণ সুরে কান্নার শব্দ শোনা যায়। শব্দটি প্রথমে দূর থেকে আসছিল, কিন্তু ক্রমেই তা কাছে আসতে থাকে। সুমন ঠান্ডা ঘামে ভিজে যায়। সে তার নোটবুকটি মাটিতে ফেলে দেয় এবং বাড়ির বাইরে দৌড়াতে চায়। কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছানোর আগেই দরজাটি নিজের থেকেই বন্ধ হয়ে যায়।
হঠাৎ, সুমন অনুভব করে, তার চারপাশে কেউ ঘুরে বেড়াচ্ছে। অদৃশ্য কোনো শক্তি যেন তার গলা চেপে ধরার চেষ্টা করছে। সুমন চিৎকার করতে চায়, কিন্তু তার গলা দিয়ে শব্দ বের হয় না।
তখন সে একটি ছায়ামূর্তি দেখতে পায়। মূর্তিটি একটি মেয়ের, যার মুখ বিকৃত এবং চোখ থেকে রক্ত ঝরছে। মেয়েটি ধীরে ধীরে সুমনের দিকে এগিয়ে আসে।
বাঁচার চেষ্টা
সুমন দৌড়ানোর চেষ্টা করে, কিন্তু পা যেন মাটিতে আটকে গেছে। মেয়েটি তাকে ধরে ফেলে এবং গলায় হাত দিয়ে চাপ দিতে থাকে। সুমনের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। হঠাৎ, সে তার পকেট থেকে একটি লাইটার বের করে এবং সেটি জ্বালিয়ে দেয়। আলো পড়তেই মেয়েটির মূর্তি হাওয়ার মতো মিলিয়ে যায়।
সুমন সুযোগ বুঝে দরজার দিকে দৌড়ায়। সে জানে, এই জায়গা তার জন্য নয়। বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসার পর সে আর পেছনে ফিরে তাকায় না।
শেষকথা
পরদিন সকালে গ্রামবাসীরা দেখতে পায় সুমন গ্রামের বাইরে একটি গাছের নিচে অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে। তারা তাকে তুলে নিয়ে যায়। জ্ঞান ফিরলে সুমন যা ঘটেছিল তা জানায়, কিন্তু কেউই তাকে বিশ্বাস করে না। তবে একটি বিষয় অস্বাভাবিক ছিল—তার গলায় লাল আঙুলের দাগ ছিল, যা দেখে গ্রামের লোকেরা আর কিছু বলে না।
সুমন আর কখনো কর্ণপুরের দিকে ফিরে তাকায়নি। তবে সেই অভিশপ্ত বাড়ির ভুতুড়ে গল্পটা থেকে যায়। আজও কেউ সেই বাড়ির সামনে যেতে সাহস করে না।
m m
Comments
Post a Comment